সুনামগঞ্জ, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০

স্মৃতির পাতায় সাংবাদিক আবেদ মাহমুদ চৌধুরী

স্মৃতির পাতায় সাংবাদিক আবেদ মাহমুদ চৌধুরী

আশিস রহমান

বড়ো অসময়ে চলে গেলেন আবেদ ভাই। চলে যাওয়ার এই কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। গতকালকেও যে মানুষটা কর্মচঞ্চল ছিলো, আরটিভিতে লাইভে এসে কথা বলেছিল, সে এভাবে নিরবে চলে যাবে তা কোনো ভাবেই মানতে পারছিনা। মেনে নিতে পারছিনা। আবেদ ভাইয়ের সাথে অনেক স্মৃতি। এই সময়ে সব লিখে প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছেনা। 
আবেদ মাহমুদ চৌধুরী শুধু একজন প্রতিযশা সাংবাদিকই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সফল উদ্যোক্তা। শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। সহজ সরল রসিক মানুষ। সামনাসামনি অকপটে কথা বলে ফেলতেন। ভেতরে ক্ষোভ রাখতেন না। দ্রুত রেগে যাওয়া এই মানুষটা আবার মুহূর্তেই আপন করে নিতে পারতেন। বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারতেন না। হাসি দিয়ে রাগ মিটিয়ে ভালোবেসে বুকে টেনে নিতে পারতেন।
আবেদ ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ফেসবুকে। আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। দৈনিক সুনামগঞ্জের ডাক পত্রিকার দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতাম। একদিন রাতে আবেদ ভাই ফেসবুকে আমাকে নক করলেন। আমার মোবাইল নাম্বার চাইলেন। আমি নাম্বার দিতেই পরক্ষণে আমাকে কল দিলেন। সেই তখন থেকেই তার সাথে আমার পরিচিত হওয়া। আমাকে জানালেন খুব শিঘ্রই একটি দৈনিক পত্রিকা বের করবেন। তিনি নতুন উদ্যমী তরুণদের নিয়ে কাজ করতে চান। আমাকে নিয়ে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করলেন। আমিও প্রথম পরিচয়েই সম্মত হলাম। 
২০১৭ সালের শুরুতেই পত্রিকা বের করার কথা জানালেন আমাকে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় পত্রিকার প্রতিনিধির নিয়োগ প্রায় ঠিক করা হয়ে গেছে। আমরা তরুণ একটা টিম আবেদ ভাইয়ের সাথে যুক্ত হলাম। শামসুল কাদির মিছবাহ ভাই বার্তা সম্পাদক, শহীদ নূর ভাই চীফ রিপোর্টার, আমি ও কর্ণ স্টাফ রিপোর্টার। কিন্তু সে বছর শেষ পর্যন্ত আর পত্রিকা বের হলোনা। আমরা অনেক চাপাচাপি করলাম। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে বাজারে আসলো দৈনিক আজকের সুনামগঞ্জ। জেলায় এই প্রথম কোনো স্থানীয় পত্রিকা একটানা ২০ সংখ্যা ৮ পৃষ্ঠা রঙিন আকারে বের হয়েছে। আর এটা একমাত্র আবেদ ভাইয়ের কারণেই সম্ভব হয়েছে। 
আবেদ ভাই আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। ভালোবাসতেন। পত্রিকায় যাথে রেগোলার সময় দিতে পারি সেজন্য তিনি আমার থাকা, খাওয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন। মুক্তার পারায় তার এক আত্মীয়ের মালিকানাধীন রহমান বেকারিতে থাকতাম। লঞ্চঘাটে খাওয়া দাওয়া করতাম। লঞ্চঘাটে রিক্সায় করে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। হোটেল মালিকের সাথে আলাপ করে দিয়েছিলেন যাতে এখানে এসে আমি দুবেলা খেতে পারি। মাস শেষে আবেদ ভাই নিজেই বিল পরিশোধ করতেন। এরপর কিছুদিন রহমান বেকারিতেও খাওয়া দাওয়া করেছি। সেখানেও আবেদ ভাই নিজেই বিল পরিশোধ করতেন। প্রতিদিন কয়েক বার কল দিতেন। খোঁজখবর রাখতেন। এভাবেই অভিভাবকের মতো আমাকে সবসময় আগলে রেখেছেন। আশ্রয় দিয়েছেন। প্রশ্রয়ও দিয়েছেন। 
পৌর বিপনির দ্বিতীয় তলায় অফিস করতাম। অফিসের এক রুমে আবেদ ভাই বসতেন। পাশের রুমটা ছিলো নিউজ রুম। নিউজ রুমে আমাদের সবার আসন সংরক্ষিত করা ছিলো। দরজার পাশেই বসতেন বার্তা সম্পাদক মিছবাহ ভাই, পশ্চিমে ওয়াল ঘেঁষে বসতেন শহীদ নূর ভাই, আমি বসতাম দক্ষিণে ওয়াল ঘেঁষে। আবেদ ভাই কখনো আমাদের সাথে সম্পাদকের গরীমা দেখাননি। আমাদের সবার কথা শুনতেন। গুরুত্ব দিতেন। প্রেসের কর্মচারীরা ভাইকে স্যার বলে ডাকতো। আমরা সবসময়ই ভাই ডাকতাম। আমাদের সাথে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। যতোদিন কাজ করেছি এরমধ্যে কোনোদিনই আমাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেননি। আন্তরিকভাবেই সবাই একসাথে মিলেমিশে কাজ করতাম। দৈনিক আজকের সুনামগঞ্জ পরিবারে বয়সে আমি সবার কনিষ্ঠ ছিলাম। তিনি আমাকে ছোট্ট ভাই ডাকতেন। আমার লেখার প্রশংসা করতেন। আমাকে এসাইনমেন্ট দিতেন। আমি পরদিনই ঝটপট এসাইনমেন্ট প্রস্তুত করে অফিসে জমা দিতাম। আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে পত্রিকায় প্রমোশন দিয়েছিলেন। সেরা প্রতিবেদক হিসেবে একটা ট্যাব পুরষ্কৃত করেছিলেন। এক হাজার ভিজিটিং কার্ড উপহার দিয়েছিলেন। এভাবেই আবেদ ভাই আমাকে উৎসাহিত করতেন।

একবার এক ক্রাইম নিউজ করে সমস্যায় পড়েছিলাম। আমার মোবাইলে একের পর এক কলে হুমকি আসছিল। আমি তখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছি। ভাইয়ের কাছে সব বিষয় শেয়ার করলাম। তিনি আমাকে অভয় দিলেন। আমাকে নিয়ে থানায় জিডি করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। হুমকিদাতার সাথে তিনি নিজেই মোবাইলে কথা বললেন। সেদিনের দুঃসময়ে তিনি আমার পক্ষে দৃঢ় ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। ভাইয়ের দৃঢ়তায় শেষ পর্যন্ত হুমকিদাতা নিজেই এসে ক্ষমা চেয়ে গেছে। 
শুরুর একবছর পত্রিকা বেশ ভালোই চলছিল। বাজারে একটা প্রতিযোগিতা নিয়েই আমরা সক্রিয় হয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা সেই প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পারিনি। আবেদ ভাইয়ের শারিরীক অসুস্থতা, পত্রিকার খরচ চালাতে গিয়ে আর্থিক টানাপোড়ন, নানান সীমাবদ্ধতা এককথায় সবমিলিয়ে পত্রিকাও তখন অনিয়মিত হয়ে যায়। মাঝখান দিয়ে অনেকেকে ছাটাইও করা হয়। কর্ণ অব্যাহতি নেয়। শহীদ নূর ভাই চলে যায় দৈনিক সুনাম কন্ঠে, মিছবাহ ভাইও শারীরিক অসুস্থতায় নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। শুরু থেকে এই পর্যন্ত শুধু রয়ে গিয়েছিলাম আমি। এরই মধ্যে দৈনিক সুনামগঞ্জ প্রতিদিন পত্রিকায় কাজ করার অফার পেলাম। দৈনিক আজকের সুনামগঞ্জ ছেড়ে সুনামগঞ্জ প্রতিদিনে যোগ দেব এখবর ভাইকে জানাতেই তিনি আমাকে মানা করলেন না। সেদিন আমাকে বললেন, ‘সবাই আমাকে ছেড়ে গেলো আশিস। এখন তুমিও আমাকে ছেড়ে যাবে? আচ্ছা যাও …। তোমার জন্য আমার দরজা সবসময়ই খোলা। ভালো করে পড়াশোনা কর। ক্যারিয়ার গড়ো। এই সাংবাদিকতা আমাদেরকে কিছুই দেয়নি। এর পিছনে ঘুরে ঘুরে নিজের জীবনের সম্ভাবনাটা নষ্ট করে দিয়ো না। পড়াশোনায় মনোযোগী হও। ভালো করে পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হও। সাংবাদিকতা পরেও করতে পারবে…।’ আমার প্রতি ভাইয়ের সেদিনের উপদেশমূলক কথা গুলো আজ বেশ মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে এখনো শুনতে পাচ্ছি। কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। 

ব্যক্তি জীবনে আবেদ ভাই দুই কন্না সন্তানের জনক ছিলেন। তাদের খুব স্নেহ করতেন। অফিসে বসে আমাদের সাথে প্রায়ই পারিবারিক গল্পও করতেন। ছোট্ট মেয়েটাকে মা বলে ডাকতেন। অফিসে এসেও মোবাইলে সন্তানদের খোঁজখবর নিতেন। সহজেই সন্তানদের মনোভাব বুঝতে পারতেন। মিশুক ছিলেন। একজন সফল উদ্যোক্তা ছিলেন। ব্যবসায় উন্নতিও করেছিলেন। একুশে অফসেট প্রেসকে নিজের মতো সাজিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা স্বত্তাধিকারী ছিলেন। আর টিভির স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। দৈনিক আজকের সুনামগঞ্জ ও সাপ্তাহিক সুনামগঞ্জের কথা’র সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটিতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। পৌরবিপনির মসজিদ পরিচালনার দায়িত্বেও ছিলেন। সর্বশেষ তিনি বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছেন বিপুল ভোটে। একসাথে এতো কিছু হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। সুনামগঞ্জের সকল সাংবাদিকসহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষদের সাথেই তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। 
২০১৯ সালের ১ মার্চ দৈনিক আজকের সুনামগঞ্জ থেকে বিদায় নিয়েছিলাম। ভাইয়ের মন খারাপ। সেদিন অফিসের করিডোরে পাশাপাশি দাড়িয়ে তার সাথে  সর্বশেষ একটা ছবিও তুলে ছিলাম। গতকালকে ফেসবুকে আরটিভির সংবাদে লাইভে দেখেছিলাম আবেদ ভাইকে। রেইনকোট পড়ে সুনামগঞ্জ থেকে বাস দুর্ঘটনার সর্বশেষ সংবাদ জানাচ্ছিলেন। কেন জানি রাত্রে একবার মনটা টান দিয়েছিল ভাইকে কল দেব। ঘড়িতে সময় তখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা। তাই আর কল দেইনি। সকালে ঘুমটা ভাঙ্গলো দুঃসংবাদ শোনে। সংবাদের ফেরিওয়ালা আবেদ ভাই তখন নিজেই সংবাদে পরিণত হবেন কে জানতো?
দোয়ারার এক সহকর্মী কল দিয়ে জানালো আবেদ ভাই আর বেচেঁ নেই। খবরটা আমি গুজব বলেই উড়িয়ে দিলাম। ফেসবুকে ডুকেও দেখি একই সংবাদ। একুশে অফসেট প্রেসের মেশিনম্যান জাহাঙ্গীর ভাইকে কল দিলাম। তিনি ভাইয়ের খুব কাছের মানুষ। এমন কিছু ঘটলে সবার আগে তিনিই জানার কথা। তিনিও বললেন এরপর কিছুই জানেন না। গুজব বলে উড়িয়ে দিলেন। মনে একটা স্বস্তি এলো। কিছুক্ষণ পরেই আবার জাহাঙ্গীর ভাইয়ের কল। জানালেন তিনি এখন আবেদ ভাইয়ের বাসায় আছেন। এও জানালেন গুজব নয় সত্যিই আবেদ ভাই আমাদেরকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন কিছুক্ষণ আগে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। 
দীর্ঘদিন সংস্পর্শে কাজ করা এই সহকর্মীর পরিবারকে সমবেদনা জানানোর মতো ভাষা খোঁজে পাচ্ছিনা। যখন মৃত্যু সংবাদ শুনছি তখন অঝোরে বৃষ্টি পরছিল। সাংবাদিক আবেদ মাহমুদ চৌধুরী ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে শ্রাবণের অঝোর ধারার মতোই আমাদের হৃদয়ক্ষরণ হচ্ছে। মহান আল্লাহ তায়ালা উনাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন এই দোয়া করি।
লেখক সাবেক সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টারদৈনিক আজকের সুনামগঞ্জ। 

নিউজটি শেয়ার করুন:
© দৈনিক আজকের সুনামগঞ্জ
বাস্তবায়নে : Avo Creatives