সুনামগঞ্জ, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০

সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর কন্ঠে কেবলই শুধু বাঁচার আকুতি

সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর কন্ঠে কেবলই শুধু বাঁচার আকুতি

বানভাসিরা বাড়ি-ঘর ছেড়ে যাচ্ছেন স্বজনদের উঁচ বাড়িতে

তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ:
সপ্তাহ ব্যাপী ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় হাওরে বিছিন্নœ দ্বীপ সদৃশ্য গ্রাম গুলোর অসংখ্য মানুষ তাদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে আশপাশের উচু স্থানে থাকা অত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে ও বন্যায় কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। কর্মজীবী মানুষেরা এখন কর্মীন হয়ে চরম কষ্টে দিনযাপন করছেন। অশ্রয় কেন্দ্রে ও হাওরে পানি বন্ধি অসংখ্য পরিবার ত্রানের জন্য হাহাকার করছেন। নারী-শিশু, বয়ষ্ক মানুষ, গরু, ছাগল, হাস-মুরগীসহ গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে সব চেয়ে বেশী শংকিত তারা। বন্যা কবলিত ক্ষতিগ্রস্থ দুর্গত হাওরবাসীর কন্ঠে কেবলই শুধু বাঁচার আকুতি।
সরেজমিন হাওরের অনেক গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে দুর্গম গ্রামগুলোতে দুর্গত মানুষেরা ত্রাণ পাওয়ার আশায় অপেক্ষ করছেন। ট্রলার নৌকা দেখলেই তারা ত্রানের জন্য জড়ো হয়ে ভীড় জমান তারা। বন্যার কারণে হাওর এলাকার বয়ষ্ক মানুষ, নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন। স্যানিটেশন ব্যবস্থা ডুবে যাওয়ার কারণে ঘরবন্ধি নারীরা সবছেয়ে বেশী দুর্ভোগে পঢ়েছেন। শিশুরা পরিবারের লোকজনের অগোচরে হাওরের পানিতে ডুবার ভয় তাদের আতঙ্কিত করছে প্রতিনিয়তই। হাওরের বাসিন্ধা হারুন মিয়া বলেন, বন্যার পানি বেড়েছে বেশী। ডেউয়ের কারণে বাড়ি-ঘর নিয়া চিন্তায় আছি। বাড়ির চারপাশে শুধু পানি বাচ্চা-কাচ্চা আর মহিলাদের নিয়া বেশী বিপদে আছি। ফারুখ মিয়া বলেন, ঘরের ভিতরে ফানি আমার ছোট বাচ্ছা আর গর্ভবতি স্ত্রী নিয়া খুব বিপদে আছি। টয়লেট ডুবে গেছে মহিলারা আছে বিপদে। ঘরে খাওন নাই, কোন সাহায্যও পাইনাই জাল দিয়ে মাছ ধরে বিক্রি করে আমার সংসার চলতো, এহন মাছ ধরা বন্ধ হের লাইগা কষ্টে দিন কাটাইতেছি।
জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাই চেয়ারম্যান গোলাম জিলানী আফিন্দী রাজু বলেন, পরিষদ থেকে ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা বন্যার্থদের সহযোগীতা করে যাচ্ছি। তবে দিনমজুর, জেলে ও শ্রমজীবী নারী পুরুষ সবাই বেকার হয়ে আছেন। কাজের জন্য কোথাও যেতে পারছেন না। তাদের হাতে টাকা নেই ঘরে খাবার নেই এমন এক কঠিন অবস্থায় পড়ে দিশাহারা অবস্থায় রয়েছেন তারা। বিপর্যয়ে পড়েছেন শ্রমজীবী লোকজন। তারা কোন আয়রোজগার করতে পারছেন না। এজন্য উপজেলার ছযটি ইউনিয়নে ত্রাণ বিতরণ কর্যক্রম থেকে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করে বরাদ্দ ও শুকনো খাবার বিতণে কাজ চলমান রয়েছে। তবে বরাদ্ধ আরো বেশি পরিমাণে দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। জেলা প্রশাসনের বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা যায়, জেলার ১১ টি উপজেলা ও চারটি পৌরসভার ইতিমধ্যে ৮৫৫টি আশ্রয় কেন্দ্রে খুলে ২ হাজার ২৯৭টি পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে পুরুষ ৩ হাজার ৩৬৪ নারী ৩ হাজার ১১২ জন ও শিশু ২ হাজার ৭০৮ জন। সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ছাতক, দোয়ারাবাজার, শাল্লা, দিরাই, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, ধর্মপাশা, জগন্নাথপুর উপজেলা ও চারটি পৌর সভার ৯৮ হাজার ৯৫৬ টি পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রাথমিক ভাবে জানা গেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ৮৫৫ মেট্রিকটন চাল, প্রায় অর্ধ কোটি টাকা, ২ হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ২ লাখ টাকার গো খাদ্য আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে ৬৬২ টি গবাদি পশু নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় একটি করে মেডিকেল টিম স্বাস্থ্য সেবার কাজে নিয়োজিত রয়েছে বলে জানা গেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে বিভিন্ন গ্রামে লাখো কাচা ঘর-বাড়িতে পানি প্রবেশ করায় ঘর-বাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রোপ আমন, পুকুরের মাছ নদীর পানিতে ভেসে গিয়েছে। গবাধি পশুর খাদ্য সংকট, পয়:নিষ্কাশনে চরম আকার ধারন করেছে। জেলা শহরের সাথে জামালগঞ্জ-সাচনাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর-তাহিপুর, দিরাই, শাল্লার একমাত্র সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলা শহরের পানি কিছুটা কমলেও হাওরের পানি একনো বাড়ছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোঃ শরিফুল ইসলাম, পৌরসভার মেয়র নাদের বখত জেলা সদরের ৫টি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া ৬৫০টি পরিবারের মাঝে খিচুরি বিতরণ করেন। সুনামগঞ্জ-১ নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ও জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ^জিত দেব বন্যার্থদের খাদ্য বিতরণ করছেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানান, জেলায় আশ্রয়কেন্দ্র গুলোতে আশ্রয় নেয়া বন্যাতদের মাঝে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে শুকনো খাবার চিড়া, মুড়ি, গুড়, স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট প্রদান করা হচ্ছে। দুর্গম হাওর এলাকাতেও আমাদের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, সুনামগঞ্জ ১ নির্বাচনী পুরোটাই বিশাল হাওর বেষ্টিত। হাওরের প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকার গ্রামগুলোতে বানবাসী মানুষের পাশে গিয়ে প্রতিদিনই খোঁখবর নিচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে মানুষের প্রাথমিক প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। বন্যা কবলিত মানুষ যাতে কোন কষ্ট না করে সেদিকে বিশেষ নজর রাখছি। আগামীতে হাওর এলাকায় ‘ভিলেজ প্রটেক্সন ওয়াল’ নির্মান করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বন্যায় মারা যাওয়া মানুষকে দাফনের সুব্যবস্থার জন্য হাওর এলাকার কবর স্থান ও শ্মশানগুলো উঁচু করে নির্মান করা হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন:
© দৈনিক আজকের সুনামগঞ্জ
বাস্তবায়নে : Avo Creatives