সুনামগঞ্জ, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০

২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা

২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা

চৌধুরী ভাস্কর হোম, মৌলভীবাজার অফিসঃ
বাঙালির সংস্কৃতিতে বারো মাসে তেরো পার্বনের একটি পার্বন হলো পৌষ সংক্রান্তি। মূলত: অগ্রয়াহণের ধান কাটার পর থেকে শুরু হয় নবান্ন উৎসব। প্রকৃতিনিভর অনেক পার্বন আজ বিলুপ্ত হলেও দেশের বিভিন্নস্থানে এখনো পৌষ সংক্রান্তিকে ঘিরে আয়োজন হয় মাছের মেলা। প্রায় দুইশত বছর পূর্বে মৌলভীবাজারের শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর তীর জুড়ে শুরু হয়েছিলো মাছের মেলা। ২০০ বছরের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এবার নানা জাত আর আকারের মাছের সমারোহ নিয়ে শুরু হয়েছে এই মাছের মেলা। সোমবার (১৩ জানুয়ারি) বিকেল থেকে হাকালুকি, টাংগুয়া, কুশিয়ারা নদী, হাইল হাওর, কাউয়াদীঘি হাওর, বড় হাওর, সুরমা ও মনু নদীসহ সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছ নিয়ে আসতে শুরু করেন মৎস্য ব্যবসায়ীরা। মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাওর, নদী, বিলসহ নানা জলাশয়ের মাছ নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়ীরা। বোয়াল, আইড়, বাঘাইড়, চিতল, কাতলা, বাউশ, কালাবাউশ, রুই; ছোট-মঝারি-বড় নানা আকারের মিঠা পানির সু-স্বাদু মাছ। কোনোটার আকার ১৫ কেজি, কোনোটা ৮ কেজি। আবার কোনোটা ৫০ কেজি ছাড়িয়ে গেছে। যেন মাছের মেলা, সমারোহ। বৃহৎ সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক জলাশয়ের সু-স্বাদু মাছ। বৈদ্যুতিক বাতি আর কুপির আলোয় ঝলমলে বড় বড় রুই-কাতলা আর চিতল-বোয়ালের রুপালি শরীর। পাইকার আর খুচরা ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে শীতের রাতে সরগরম হয়ে ওঠেছে কুশিয়ারার পাড়।এর টানে মাছের মেলায় জড়ো হন দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ। এটাই বাঙলার ঐতিহ্য। শেরপুরের মাছের মেলাতে মাছ প্রধানতম উপাদান হলেও অন্যান্য জিনিসেরও কমতি নেই। বেত-বাঁশ, কাঠ, লোহা ও মাটির তৈরি নানা রকম পণ্য। শিশুদের খেলনা, সবজি-আনাজ, খাদ্যসামগ্রী অনেক ধরনের লোকজ পণ্য মেলার সহস্রাধিক দোকানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। মৌলভীবাজারের জেলা শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে শেরপুর মাছের মেলা ঘুরে স্থানীয় মানুষের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, প্রায় ২ শত বছরের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতি বাংলা সনের পৌষ মাসের শেষ দিনে কুশিয়ারা নদীর পাড়ে শেরপুরে আয়োজন করা হয়েছে মাছের মেলা। এখানে রাত গভীর হলেই শুরু হয় বেচাকেনা। দূর-দূরান্ত থেকে মাছ নিয়ে যেমন বিক্রেতারা আসেন, তেমনি আসেন পাইকারেরা ও খুচরা ক্রেতারা। একসঙ্গে বড় আকারের বিভিন্ন জাতের এত মাছ দেখার সুযোগ হাতছাড়া না করতে আসেন অনেক দর্শকও। তাঁরা ঘুরে ঘুরে মাছ দেখেন, দাম জানতে চান। মেলার মধ্যে ঢুকতেই চোখে পড়ে আড়তে আড়তে স্তুপ করা ছোট-বড় নানা জাতের মাছ। মাছ কিনতে মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছেন পাইকারেরা। একেকটি আড়তে মাছের বাক্স-পেটরা খোলা হয়, আর দরদাম হাঁকা নিয়ে চলছে চিৎকার-চেঁচামেচি। পাইকারী মাছ ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, মাছের মেলা এ অঞ্চলের একটি ঐতিহ্য। মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকাটি উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাওর-নদীর মাছ ছাড়াও খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থানের মাছ আসে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মতিন বলেন, এটা সৌখিন মানুষের মেলা। হাজার টাকার নীচে কোন মাছ পাওয়া যায় না। বড় ব্যবসায়ীরা সপ্তাহ খানেক পূর্বে বড় বড় মাছ সংগ্রহ করতে থাকেন। মেলায় ছোট আকারের মাছের দাম হাকানো হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা, মাঝারি সাইজের মাছের দাম হাঁকানো হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং বড় সাইজের মাছের দাম ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকাও হাঁকানো হয়। এক রাতেই মাছের মেলায় কোটি কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়ে থাকে। সিলেট থেকে এসেছেন প্রবাসি আমিরুল ইসলাম। ১২ হাজার টাকায় কিনেছেন একটি চিতল মাছ। মৌলভীবাজারের আরেক ক্রেতা ইমন দেব চৌধুরী ২৫ হাজার টাকায় কিনেছেন এ অঞ্চলের বিখ্যাত আইড় মাছ। তিনি বলেন, দাম বিষয় নয়। শখটাই বড়। পুরো বছর এদিনটার জন্য অপেক্ষা করি। আরেক ক্রেতা আব্দুল হাকিম বলেন, আজকালের ছেলেমেয়েরা মাছ চেনেনা। তাদের মাছ চেনাতেই বাজারে নিয়ে এসেছি। মাছ ব্যবসায়ী উমেদ মিয়া বলেন, লাখ টাকার মাছ নিয়ে এসেছি। আশা করছি ভালো বিক্রি হবে। কুশিয়ারা নদীর প্রসিদ্ধ চিতল মাছ মেলায় তুলেছেন শামছুল ইসলাম। প্রায় ২০ কেজি ওজনের চিতল মাছটি ৩২ হাজার টাকা দাম হাঁকছেন শামছুল ইসলাম। হাকালুকি হাওর থেকে বিশাল আকারের ১ জোড়া কাতল ও ১ জোড়া বোয়াল নিয়ে এসেছেন হিরা মিয়া ও লাল মিয়া। কাতলের জোড়ার দাম হাঁকছেন ২৬ হাজার এবং বোয়ালের জোড়ার দাম হাঁকছেন ৪৮ হাজার টাকা। মাছের এমন দাম শুনে আশপাশের অনেকে জানালেন, এ রকম দামের অনেক মাছ রাত ১২টার মধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন:
© দৈনিক আজকের সুনামগঞ্জ
বাস্তবায়নে : Avo Creatives