Logo
সোমবার ৮ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ১১ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

তরঙ্গ প্রবাহে আপনার সন্তানের শৈশব

আমাদের বর্তমান সময়ে সকল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে মোবাইল। সেই যোগাযোগকে নিরবিচ্ছিন্ন করতে মোবাইল সেটের বিকল্প নেই। তাই আমরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের মোবাইল সেট ব্যবহার করি। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিটি এলাকা মোবাইল টাওয়ারের আওতায় নিয়ে আসার জন্য মোবাইল কোম্পানিগুলো কাজ করে যাচ্ছে। একেকটা টাওয়ার থেকে আর একটা টাওয়ারে সিগন্যাল প্রেরণ এবং গ্রহণ করার জন্য নির্দিষ্ট দূরত্ব অনুযায়ী মোবাইল টাওয়ার বসানো হয়। সাধারণত গ্রামে ৪-৫ কিলোমিটার এবং শহর এলাকায় গ্রাহক সংখ্যা অনুযায়ী ৩০০ মিটার থেকে ১ কিলোমিটার দূরে পর্যন্ত মোবাইল টাওয়ার বসানো হয়ে থাকে। বিকিরণের আয়নিক ক্ষমতা অনুযায়ী মোবাইল টাওয়ার বসানোর ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। সেই নিয়ম গুলোর মধ্যে প্রধান লক্ষ হচ্ছে আশে পাশের কোন কিছুর উপর যাতে বিরূপ প্রভাব না পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে টাওয়ারগুলো নন-আয়নিক বিকিরণ বলা হলেও বিকিরণ প্রতিবন্ধকতা তেমন একটা পরিলক্ষিত হয় না। মোবাইল টাওয়ার সাধারণত খোলা স্থানে ভূমি থেকে ২৫ মিটার বা তারও উপরে উচ্চতার নিয়ম মেনে তৈরি করতে হয়। কিন্তু শহর এলাকায় খোলা জায়গা তেমন পাওয়া যায় না বিধায় মোবাইল কোম্পানিগুলো বড় বড় বিল্ডিং এর উপরে টাওয়ার করে যা তাদের অর্থনৈতিকভাবেও অনেক টাকা সাশ্রয় করতে সাহায্য করে। শহরে ঘনবসতি বেশি থাকায় মোবাইল টাওয়ারের কিছু ক্ষতিকর প্রভাবও চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে যা আমাদের সাধারণ মানুষের নজরে খুব একটা আসে না বা আমরা বুঝতে পারি না। সাধারণত মোবাইল টাওয়ারগুলো ৩৬০⁰ সিগন্যাল ধরার জন্য কয়েকটি অ্যান্টেনা দিয়ে তরঙ্গ প্রেরণ এবং গ্রহণ করে থাকে। তরঙ্গের মাধ্যম হচ্ছে টাওয়ার থেকে টাওয়ারে মাইক্রো-ওয়েভ বা ক্ষুদ্র তরঙ্গ এবং টাওয়ার থেকে মোবাইল সেটে বেতার তরঙ্গ প্রেরণ এবং গ্রহণ করে থাকে। তরঙ্গের আয়নিক ক্ষমতা অনুযায়ী সিগন্যাল প্রেরণ এবং গ্রহণের ফলে এক ধরণের বিকিরণের সৃষ্টি হয় যা আমাদের পারিপার্শ্বিক দিক বিবেচনা করলে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এই সমস্যাগুলোর সুদীর্ঘ প্রভাব আমাদের জীবনের মধ্যে পরিলক্ষিত হতে পারে। শহর এলাকায় বড় বড় বিল্ডিং এ মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের কারণে তরঙ্গ বিকিরণে মানব দেহের পাশাপাশি উদ্ভিদের মধ্যেও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ও দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব বিস্তার রাখতে পারে। ক্ষুদ্র তরঙ্গ বিকিরণের ফলে শুরুতে তেমন কিছু প্রভাব বুঝা না গেলেও তা ধীরে ধীরে মানুষিক যন্ত্রণার কারন হয়ে ধারাতে পারে। এই তরঙ্গের মধ্যে দীর্ঘ দিন চলাফেরা বা এর নিচে অনেকক্ষণ কাজ করলে তার প্রভাব ওই সব মানুষদের মাঝে বিস্তার লাভ করতে পারে। সেই প্রভাবগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাথা ব্যাথা, মানসিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিতে বাধাগ্রস্থ, গর্ভবতী মহিলাদের মাতৃত্বকালীন সময়ে নানাবিধ সমস্যা, নবজাতকের শারীরিক সমস্যা, পুরুষ ও মহিলাদের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং এমনকি দীর্ঘদিন ওই তরঙ্গ বিকিরণের কারণেও মানবদেহে ক্যানসার এর মত মরণব্যাধি বাসা বাধার সম্ভাবনা থেকে যায়। অন্যদিকে এই তরঙ্গ বিকিরণের ফলে উদ্ভিদেরও নানাবিধ সমস্যা দেখা দিতে পারে। মাটির উর্বরতা হ্রাসের পাশাপাশি উদ্ভিদের ফলন কমে যাওয়ার সাথে সাথে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে। তাই মোবাইল কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষদের মোবাইল টাওয়ারের তরঙ্গ বিকিরণের প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলা এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন অনেকাংশে দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে পারবে। পাশাপাশি ছোট ছোট বাচ্চাদের মধ্যে মোবাইল সেট ব্যবহার করাও কিন্তু তাদের কিছু নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হতে পারে যা আমাদের জন্য অস্বস্তিকর অবস্থা বয়ে আনতে পারে।

প্রারম্ভিক শৈশব হচ্ছে সেই সময়টা যখন শিশুর যত্ন ও বেড়ে ওঠার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি খেয়াল করা প্রয়োজন। শিশুর জন্মের পর প্রথম কয়েকটা বছর তার বেড়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল যা শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের পরিবর্তন এনে দিতে পারে। সৃষ্টিকর্তার বিধানে সন্তানের সাথে মায়ের সম্পর্ক চিরন্তন। কিন্তু মায়ের পর পরই যার প্রয়োজন একান্ত গুরুত্বপূর্ণ, তিনি হলেন সন্তানের বাবা। জন্মের একটু পরই একটি শিশু চিনতে শুরু করে তার মাকে। জন্মের দুই মাসের মধ্যে সে তার বাবাকে সনাক্ত করতে পারে। মায়ের পাশাপাশি বাবাও শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে। তাই মায়ের পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই বাবার সাথে শিশুর সখ্যতা গড়ে ওঠা অত্যন্ত জরুরী। মা-বাবার কণ্ঠস্বর, চেহারা এমনকি শরীরের গন্ধ প্রতিটি শিশুর মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে যা পরবর্তীতে শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এক ধরনের অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আপনার সন্তানকে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠগ্রহণে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করার উপযুক্ত জায়গা হলো শ্রেণিকক্ষ। ফলে পরিবারের পাশাপাশি প্রশ্ন ও উত্তর তৈরির বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে বুঝতে পারা এবং সে অনুসারে তা প্রয়োগ করার সক্ষমতাও তৈরি হয়। সন্তানকে অধিক স্নেহ করার কারনে তাঁর সকল আবদার আমরা মেনে নিতে চাই এবং তাঁর ওই সব পূরণ করতেও আমাদের কোন রকম কার্পণ্য কাজ করে না। কিন্তু আমরা বুঝতে চাই না যে, সকল আবদার তাঁর বয়সের সাথে মানানসই নয় বা তাকে একটু ভাল করে বুঝিয়ে অন্য কোন ভাল কাজ করতে উৎসাহিত করা।
“সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেন, ভাল মন্দের খুঁজ নেন আর ভাল বন্ধু হউন”
বর্তমান তত্ত্বপ্রযুক্তির বিশ্বে প্রতিটা পরিবারেই এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সকলের মাঝে প্রযুক্তির নিত্যনতুন যন্ত্রসমূহ ব্যবহারের মাত্রা পরিলক্ষিত হয় যার মধ্যে তরুণদেরই অনেকাংশে বেশি দেখা যায়। প্রযুক্তির এই মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারেই আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হুমকির মুখে ধাবিত করছে। শিক্ষাগত সাফল্যের জন্য অভিভাবকরা খুব বেশি যত্মশীল হলেও অধিকাংশই জানেন না যে, মানসিক উদ্দীপনা ও নিরাপত্তার অভাব সন্তানের বিকাশের কর্মকাণ্ডেও ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমরা প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেক অগ্রসর হচ্ছি তেমনি আমরা আমাদের বাচ্চাদেরকে নিজেদের জানতে অজান্তে এইসব ব্যবহার করতে দিচ্ছি যা তাদেরকে মূল পড়ালেখার বাইরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এতে তাদের অনেক ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় যা এই ছোট্ট বয়সের ভবিষ্যৎ কর্ণধারের জন্য মোটেই ভাল কিছু বয়ে আনবে না।
*দীর্ঘ সময় ব্যবহার মানসিক বিকাশের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
*অধিক সময় দেয়ার কারনে চোখের বিভিন্ন সমস্যা
*অনিদ্রা এবং স্নায়ুবিক বিভিন্ন সমস্যার উদ্ভব
*সন্তানের নেতিবাচক অভ্যাসগুলুর আবির্ভাব
*পড়ার প্রতি মনোযোগ বিকাশে ব্যাঘাত সৃষ্টি
*সন্তান ভাল কিছুতে নিরুৎসাহিত হওয়া
*সন্তানের সঙ্গে বুঝাপড়ার ব্যবধান সৃষ্টি
*প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলু এড়িয়ে যাওয়া

শিশুদের মাঝে মানসিক ও শারীরিক ঘাটতি বা কমতির অনুভূতি বিভিন্ন কারনে সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে শিশুর মনে জটিলতা বিকৃ্তি কিংবা খারাপ ও অসৎ জীবন যাপন এবং অপরাধ প্রবনতা দেখা দিতে পারে। তাই পিতা-মাতাকে সন্তানের এই সমস্যা দূর করার জন্য সচেতন ও তাদের প্রতি আরও মনযোগী হতে হবে।
“বাচ্চার কি করতে ইচ্ছে হয় সেটা ভাল ভাবে বুঝুন। তারপর তার বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে আপনার মতামত জানান”
তত্ত্ব ও প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে তাঁর ব্যবহারকে নিজেদের উপযোগী পরিবেশে নিয়ে আসতে হবে। যন্ত্রপাতি থেকে নির্গত তরঙ্গ কিন্তু আপনার সন্তানের জন্য ভাল কিছু বয়ে আনবে না বরং তা আপনার সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এর দিকে নেতিবাচক প্রভাব ডেকে আনবে। তাই একটু সচেতনা বয়ে আনতে পারে আপনার সন্তানের মঙ্গল ও আপনার পরিবারের জন্য পরম প্রশান্তি। এই চিন্তাধারা সবার মাঝে উদয় হউক এবং সুস্থ সুন্দর সন্তান নিয়ে সকলে ভাল থাকুক এই সবুজ শ্যামল ধরণীতে।

উত্তম বনিক
রিসার্চার অ্যান্ড ব্রডকাস্ট ইঞ্জিনিয়ার


নিউজটি শেয়ার করুন