Logo
সোমবার ৮ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ১১ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

চায়ের রাজ্যে নারীদের জয়যাত্রা

ওরা সবাই বাই সাইকেল বালিকা

চৌধুরী ভাস্কর হোমঃ
দিন পাল্টেছে, পাল্টেছে চাহিদার ধরন! পরিবর্তনের এই ক্ষণে নতুন প্রজন্মের নারীরা রেশমি চুড়ি কিনে দেওয়ার বায়নার বদলে এখন সাইকেল কিনে দেওয়ার জন্যই মেয়েদের বাবা ভাইদের কাছে ধরে যত বায়না। এক একটা সময় ছিলো শুধু ছেলেরা সাইকেল চালাত মেয়েরা সাইকেল চালাত না কিন্তু এখন আর তারা ঘরে বসে নেই। খাঁ খাঁ রোদ, ঝড় কিংবা বৃষ্ঠি তাদেরকে স্পর্শ করলেও থেমে নেই তাদের অগ্রযাত্রা। ছেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তরুন প্রজন্মের মেয়েরা। চায়ের রাজ্য শ্রীমঙ্গলে ইদানীং প্রায়ই নজরে পড়ছে অনেক বাইসাইকেলে চড়ে মেয়েদের যাতায়াত। ওরা সবাই বাই সাইকেল বালিকা। এ নামেই সবার কাছে বড় আদরের, বড় বেশী গ্রহন যোগ্য। আর এতেই নারীদের স্বাধীনতা নিহিত বলে মন্তব্য করছেন অনেকেই। কয়েক বছর আগেও নারীদের অনেক সামাজিক বাধার মুখে পড়তে হতো, পরিবার থেকে চাপ থাকতো এমন কি নিরাপত্তা নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত ছিলেন। কিন্তু এ প্রজন্মের দুরন্ত নারীরা সব কুপমন্ডুকতাকে পেছনে ফেলে, সকল শংকা জয় করে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে এখন নারীদের জয়জয়কার, এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রয়েছে প্রেরণা ও নারীদের সামনের দিকে এগিয়ে নিতে তার সরকার কাজ করছে দেশব্যাপী। বিশেষ করে, দুর্গম ও অনগ্রসর এলাকায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা যাওয়ার জন্য বাই সাইকেল প্রদান করা হয়েছে। আর সেইসব মেয়েদের সাইকেলে চড়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার দৃশ্যে শহর এলাকায় বসবাস করা মেয়েরাও সাইকেলিং করার দুর্নিবার ইচ্ছা পেয়ে বসে। শুধু হাতে থাকা স্মার্টফোন ব্যবহারেই পড়ে থাকা নয়, দৈহিক ও মানসিকভাবে ফিট থাকার জন্যই অনেকে সাইকেলিং এ বের হয়। শুধু, সাইকেলিং নয়, নিজের প্রয়োজনীয় কাজটুকু সারতেও মেয়েরা সাইকেল চড়ে যাতায়াত করে। শ্রীমঙ্গল শহরে ইদানীং প্রায়শই দেখা যায় দীর্ঘ ট্রাফিক জ্যাম, এর মধ্যে দিয়েই সবাইকে পিছে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছেন নারী রাইডার। তবে শুধু বাই সাইকেলই নয়, কেউ কেউ বলছেন আরেকটু বড় হয়ে স্কুটার বাইক চালানোরও ইচ্ছে তাদের। নারী রাইডাররা বলছেন মুলত পরিবারের সহযোগীতা থাকায় আজ প্রায় শতাধিক নারী সাইকেল চড়ে ঘুরতে পারছেন। জানা যায়, মায়েরা সবসময়ই মেয়েদের একটু অন্যরকম ইচ্ছার প্রতি সমর্থন দিলেও, বাবারা একটু উদ্বিগ্ন থাকেন। তবে, কেউই সন্তানের বায়নাকে কোন শঙ্কা বা অজুহাত দেখিয়ে ফিরিয়ে দেননি। তবে, নারীদের বাহিরে এসে নিজেদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও একঘেয়েমী জীবন থেকে স্মার্ট লাইফে পদার্পনের পথে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে স্থানীয় কিছু তরুন। পুরুষ রাইডারদের পাশাপাশি নারী রাইডার তৈরী করার ক্ষেত্রে ফেসবুক ভিত্তিক গ্রুপ সাইক্লিস্ট অব শ্রীমঙ্গল (সিওএস) এর মডারেটর ও প্রশিক্ষক দীপ চক্রবর্তী বলেন“সাইকেল চালালে যে সুবিধাটা হয় বাড়ি থেকে বের হয়ে আমাকে আর গাড়ির জন্য রাস্তায় দাড়িয়ে থাকতে হয় না। তারপর যানজটে বসে থাকতে হয় না। বাংলাদেশে একটা সময় ছিল যখন ছেলেরা একটু বড় হলেই বাইসাইকেল কিনে দেয়া হতো। পাড়ার অন্য আরো অনেকে মিলে স্কুল, কলেজে ক্লাস বা প্রাইভেট পড়তে যাওয়া অথবা ঘুরে বেড়ানো সবই চলতো বাইসাইকেলে চড়ে। রাইডার বলেন,”নিয়মিত সাইকেলে চড়ে ক্লাস করি তাই সময়মত চলে আসতে পারি। সেই সাথে এটি চালালে এক্সসাইজ হয়। নিজেকে অ্যাকটিভ রাখা যায়। আমরা জানি যে ব্যায়াম করলে হ্যাপি হরমোন রিলিজ হয়। তাই মনও ভালো থাকে।” কলেজ শিক্ষার্থী মৌমিতা চৌধুরী বলেন, মেয়ে হিসেবে প্রথমে আমাকে বলা হইছে যে আমি সাইকেল চালানো শিখবো না। কিন্তু আমার দাদার উৎসাহ দাদাকে ভোরবেলা আমি ঘুম থেকে ডেকে তুলতাম যে দাদা আমাকে শিখাও, দাদা আমাকে সাইকেল চালানো শিখাইতো, আসলে দাদার উৎসাহেই আমার সাইকেল চালানো শিখা। বাবা আমাকে সাইকেল কিনে দিছলো কিন্তু পরে আমার সাইকেল শিখা হইনি, এখন আমার দিদি আমাকে সাইকেল কিনে দিছে সত্যি বলতে দিদির কারণে এখন আমি সাইকেল চালাতে আসি। আর আমার পরিবার থেকে তেমন প্রেশার দেওয়া হয় না যে তুমি মেয়ে সাইকেল চালাতে যাইবা না। কলেজ শিক্ষার্থী তিথী ভট্টাচার্য্য বলেন, আমি প্রথমে যখন সাইকেল নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছিলাম যে সাইকেল চালানো শিখবো বা কিছু একটা করবো সাইকেল নিয়ে কিন্ত আমার ভাই সাইকেল কিনছিলো তখন ওর সাইকেল চালানো দেখে আমার প্রথমে আগ্রহ জাগছে যে আমি সাইকেল চালানো শিখবো। আর তারপর থেকে দীপ ভাইয়ার কাছ থেকে আমার সাইকেল চালানো শিখা এখন আমার খুব ভালো লাগছে যে আমি সাইকেল চালাতে পারছি। কলেজ শিক্ষার্থী প্রিমিন্দিতা বৈদ্য ঐশি বলেন, আমার ছোটবেলা থেকে সাইকেলিং করার ইচ্ছে চিলো কিন্ত আমি পরিবার থেকে কোন সহযোগিতা পাইনি। অনেক ছোটবেলায় আমার ছোট ভাই আমাকে সাইকেলিং করা শিখায়। তারপর আমি একাদশ প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর আমি সাইকেলিং এ আসি, এখানে আসার পথে আমি আমার পরিবার থেকে কোন সহযোগিতা পাইনি। আমি নিজে থেকে আসছি, তারপর এখানে এসে আমি গ্রুপে যাদেরকে পাইছি তারা আমাকে সহযোগিতা করছে। এবং আমি ওদেরকে অনেক ধন্যবাদ দেই আমি আজকে তাদের জন্য এখন স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারছি। কলেজ শিক্ষার্থী শাহিনুর ইসলাম কিরণ বলেন, সাইকেল চালানোর উৎসাহ প্রথমে আমার বাবাই আমাকে দিছে বা ছোটবেরায় আমার বাবা আমাকে সাইকেল কিনে দিছে সাইকেল চালানো উনি আমাকে শিখাইছে। কখনো উনি বলে নাই যে তুমি মেয়ে তুমি সাইকেল চালাতে পারবে না। আমার পরিবার সব সময় আমার সাইকেল এর জন্য সহযোগিতা করছে এবং এখনো করে, তার জন্য আমি ধন্যবাদ জানাই সিওএসকে যারা মেয়েদের জন্য একটা প্লাটফর্ম তৈরী করে দিয়েছে। অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী মভি সুত্রধর বলেন, আমি প্রথম দিকে ছেলেদের দেখে নিজের মধ্যে ইচ্ছা জাগছিলো সাইকেলিং এর ব্যাপাওে, পরিবার থেকে উৎসাহ দিয়েছেন বাবা, সাইকেলিং করে অনেক ভালো লাগছে। সাইকেলিং অব শ্রীমঙ্গলকে ধন্যবাদ জানাই আমাদেরকে পাখা মেলে ধরার সুযোগ কওে দেওয়ার জন্য। এইচএসসি ১ম বর্ষের ছাত্রী অর্পিতা দেবনাথ মিতু বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই সাইকেল চালানোর স্বপ্ন দেখতাম, খুব একটি মজাদার বিষয় ছিলো। তবে সুযোগ হয়নি প্রথম দিকে। গেলো চারবছর ধরে নিয়মিত সাইকেল চালাচ্ছি। এটা শারিরীকভাবে শক্ত ও ফিটনেস থাকার জন্য এটা ভালো একটি ব্যায়াম। আমি কোচিং এ যেতে সাইকেল ব্যবহার করি। আর প্রতি শুক্রবারে মেগা রাইড এ যোগ দেই। শ্রীমঙ্গল সরকারী কলেজের ছাত্রী সানজিতা বলেন, আমি ততটা সাপোর্ট পাইনি পরিবার থেকে যতটা আমি ডিজার্ভ করি। আমি আমার ভাই ও আম্মুর কারনে সাইকেল চালাতে পারছি। আব্বু ততটা সমর্থন দেননি। তবুও এখন আমি আমার শখকে বাস্তবে রুপান্তরিত করতে পেরেছি। শ্রীমঙ্গল সরকারী কলেজের ছাত্রী মারজানা রামী বলেন, ছোট বেলা থেকেই সাইকেল চালাতে পারি, ছোটবেলায় মিনি বাইসাইকেল ছিলো। পাঁচ -ছ’মাস হলো নতুন সাইকেল কিনেছি। আমার পরিবার আমাকে কখনো বাধা দেয়নি। রাইডে আসা বা অন্যকোথাও ঘুরতে পরিবার বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ফেসবুক ভিত্তিক গ্রুপ সাইক্লিস্ট অব শ্রীমঙ্গল (সিওএস) এর মডারেটর ও প্রশিক্ষক দীপ চক্রবর্তী বলেন, মেয়েদেরকে বদ্ধঘর থেকে বের করে ছেলেদের মতো নিজেদের জীবনযাপন করতে, স্বাধীনসত্তা ভোগ করতে আমি এ উদ্যোগটি নিই। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে শুরু করেছে, অনেকে অবাক বিষ্ময়ে একঝাঁক মেয়েদের সাইকেল চালানো দেখে। এতে সমাজে মেয়েদের প্রতি চলে আসা যে তথাকথিত সামাজিক বাধা ছিলো, মেয়েরাও যে ছেলেদের সমকক্ষ এবং একে অপরের পরিপুরক এই মেসেজটুকু সমাজে চলে যাবে। এতে সমাজ হবে আরও মানবিক, উদার এবং নারীবান্ধব।

নিউজটি শেয়ার করুন